বগুড়াতে সনাক এর উদ্যোগে মানববন্ধন
বগুড়া অফিস:
জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে বগুড়াতে মানববন্ধন করেছে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)। আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি (পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) দিবস উপলক্ষ্যে উক্ত কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে সনাক, ইয়ুথ এনগেজমেন্ট এন্ড সাপোর্ট (ইয়েস), একটিভ সিটিজেন্স গ্রুপ (এসিজি) সহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
২৬ জানুয়ারি, সোমবার সকালে জেলা শহরের সাতমাথা চত্বরে প্রায় আধা-ঘন্টাব্যাপী চলমান মানববন্ধন কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সনাক সভাপতি অধ্যাপক মো: ওসমান গণি । ইয়েস দলনেতা, খায়রুল ইসলাম সাকিব সনাক-বগুড়ার সঞ্চালনায় মানববন্ধনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সনাক এর পরিবেশ বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য মিলন রহমান ।
মানবন্ধন চলাকালীন আলোচনায় সনাক সভাপতি অধ্যাপক মো: ওসমান গণি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও বাংলাদেশ এখনও আমদানী নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি নির্ভরশীল। তিনি আরো বলেন, সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা প্রণীত হওয়ায় নীতি পরিকল্পনা প্রণয়নে অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার চিত্র পাওয়া গিয়েছে। টিআইবির গবেষণাসহ নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণমতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অগ্রাধিকার খাতে বিবিধ অসঙ্গতি, সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম এবং দুর্নীতি বিদ্যমান। তিনি এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
দিবসটি উপলক্ষ্যে জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিতসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিবেচনার জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করে ইয়েস সদস্য মো: রাকিবুল ইসলাম |
১. রাজনৈতিক দলসমূহকে জীবাশ্ম জ¦ালানির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বন্ধ করা এবং জ¦ালানি মিশ্রণে নবানয়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করতে হবে; যার মধ্যে থাকবে-
➢ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা এবং খসড়া এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) ২০২৫ চূড়ান্তকরণের পূর্বে নাগরিক সমাজ, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজিয়ে চূড়ান্ত করা;
➢ ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তে রূপান্তরসহ নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জ্বালানি খাতে নীতি করায়ত্ত বন্ধ এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রতিরোধসহ এখাত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা;
➢ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও নবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর প্রকল্পে অর্থায়ন ও এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমানোর জন্য সময়াবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা;
➢ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর-সংক্রান্ত কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্প্রেডা) কে একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রদানসহ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা;
➢ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য তহবিল বরাদ্দ এবং গবেষণা ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করা; এবং
➢ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ সহ বিদ্যমান সকল নীতি ও পরিকল্পনায় অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
৩. নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এর উৎপাদন ও সরবরাহ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ একটি উপযুক্ত বিনিয়োগ কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।
৪. জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদান এবং দূষণ ও পরিবেশ-বিষয়ক তদারকিতে স্বচ্ছ ও যথাযথ-প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
৫. আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত জ্বালানি খাতের সকল প্রকল্প প্রস্তাব এবং চুক্তির নথি প্রকাশ করতে হবে।
৬. এনডিসি’র অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বাতিল হওয়া কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে সোলারসহ নাবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের নেট মিটারিং সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন সহজীকরণ, ফিড-ইন-ট্যারিফ কার্যকর এবং তাদের উদ্বদ্ধ করতে প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।
৮. নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে; স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।
৯. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে সুশাসন ঘাটতি ও দুর্নীতি ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্প অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, চুক্তির শর্ত নির্ধারণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতি-স্পষ্টতা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এবং নানাবিদ চ্যালেঞ্জসহ বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে এই প্রথমবারের মতো টিআইবি ঢাকাসহ, সকল সনাক এলাকায় এই দিবসটি পালন করছে।
