মাসিক “আলোচনা” ম্যাগাজিনের উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠক
বগুড়া অফিস:
গত ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পটভূমিতে আগামী ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা ধরনের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ। সাধারণ মানুষ বিগত রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতি দেখে ক্লান্ত। তাদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, নির্বাচন কি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে? জনগণ আর কোনো পক্ষপাতদুষ্ট সরকার বা নির্বাচন ব্যবস্থা দেখতে চায় না। তারা এমন একটি পরিবেশ চায়, যেখানে তারা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিদ্যমান আস্থাহীনতা এবং সংঘাতের আশঙ্কা ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় তৈরি করেছে। এছাড়া, নির্বাচনী আচরণবিধি এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও জনগণের ভাবনায় রয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ কী ভাবছেন? সেটি জানার জন্য মাসিক ‘আলোচনা’ ম্যাগাজিন একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন নাওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহা. হাছানাত আলী। সভাপতিত্ব করেন সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. বেলাল হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারুক হোসেন। সঞ্চালনা করেন, আলোচনা সম্পাদক প্রতীক ওমর।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিকেলে গোলটেবিল বৈঠকটি হয় সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজে। বৈঠকে রাষ্ট্রচিন্তক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডাক্তার, এ্যাডভোকেট, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, ছাত্র প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদগণ উপস্থিত ছিলেন। এসময় তারা বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। তারা প্রার্থীদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে তাদের ব্যক্তিত্ব, সততা ও অতীত কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিতে হবে। তারা মনে করেন, সবার আগে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনগণ তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি বাছাই করতে পারে। প্রার্থীরা যেন দুর্নীতিমুক্ত, জনকল্যাণে নিবেদিত এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী হন সেদিকটাও নিশ্চিৎ হতে হবে। এছাড়াও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশে যেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জননিরাপত্তা বজায় থাকে। নির্বাচিত সরকার যেন সুশাসন নিশ্চিত করে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করছে এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর। এই নির্বাচন জাতির জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। সাধারণ মানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশাগুলোকে সম্মান জানিয়ে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।
বৈঠকে প্রধান অতিথি নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহা. হাছানাত আলী বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। আমরা দেখেছি, বিগত বছরগুলোতে নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মূল ভাবনা হলো, তারা যেন নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং তাদের মতামতের সঠিক প্রতিফলন ঘটে। সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা রাখা অত্যন্ত জরুরি। ড. হাছানাত আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এই নির্বাচন আমাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ। দেশের মানুষ এমন একটি সরকার দেখতে চায়, যারা সুশাসন নিশ্চিত করবে, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলবে এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। তরুণ সমাজ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে থাকবে কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
আমি বিশ্বাস করি, এই গোলটেবিল আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ ও মতামতগুলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে’।
বৈঠকে সভাপতি প্রফেসর ড. বেলাল হোসেন বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি জনগণের মতামত প্রকাশের এবং তাদের পছন্দের সরকার বেছে নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার। আজকের এই আলোচনা সাধারণ মানুষের সেই ভাবনা ও প্রত্যাশাগুলোকে একত্রিত করার একটি মঞ্চ। আমি মনে করি, একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে সকলের সদিচ্ছা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য। এই গোলটেবিল থেকে উঠে আসা সুপারিশগুলো দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। আমরা চাই, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে এবং একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনে মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য প্রদান করেন, উপধ্যক্ষ, আব্দুস ছবাবুর খন্দকার, দৈনিক বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু, দৈনিক দুরন্ত সংবাদের সম্পাদক সুবর শাহ লোটাস, বগুড়ার নার্সিংহোম এর পরিচালক ডা. এএইচএম মুশিহুর রহমান, টিএমএসএস এর উপ নির্বাহী পরিচালক ডা. মতিউর রহমান, সরকারি আজিজুল হক কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ খৈয়াম কাদের, কবি একে আজাদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, ও ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স এ্যালায়েন্স’র (এনএলএ) কেন্দ্রিয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এ্যাড. মেহেদুল হাসান স্বপন, কবি মনজু রহমান, বগুড়া জেলা মহিলাদলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার, পেট্রোল পাম্প এসোশিয়েশন রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, পদ্মা ফুডসের সত্ত্বাধিকারী এমদাদুল হক বাবু, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বাপ্পা আজিজুল, এমদাদুল হক, এনসিপির জাতীয় যুবশক্তি বিভাগের বগুড়া জেলা শাখার আহ্বায়ক,মহিদ-উল-নবী (মিশু), এনসিপি শ্রমিক উইং এর কেন্দ্রীয় নেতা ডা, সানি, সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার কোষাধ্যক্ষ ফেরদৌসুর রহমান, জাতীয় ছাত্র শক্তি বগুড়া জেলা শাখার আহবায়ক এ এম জেড শাহরিয়ার জুহিন, বিশিষ্ট ব্যাংকার মনিরুজ্জামান, জাহিদুল ইসলামপ্রমুখ। অনুষ্ঠান শেষে দেশ নেত্রী বেগম খালেদার জিয়ার সুস্থতার জন্য বিশেষ দোয়া ও মুনাজাত করা হয়।
